ভূমিকা:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের খুশি করে নোবেল পেয়েছেন—এই ধরণের উদ্ভট এবং ভিত্তিহীন দাবি যখন আমাদের প্রজন্মের কারো মুখ থেকে শুনি, তখন অবাক হওয়ার চেয়ে করুণা বেশি হয়। এটি ব্যক্তি আক্রমণের পাশাপাশি আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য এবং বিশ্বমঞ্চে বাঙালির শ্রেষ্ঠত্বের ওপর এক চরম আঘাত।

১. নোবেল প্যানেল ও নিরপেক্ষতা

প্রথমত, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘নোবেল’ অর্জন করেন, তখন সেই বিচারক প্যানেল ছিল সুইডিশ একাডেমি, ব্রিটিশ সরকার নয়। ব্রিটিশদের সাথে সুইডেনের কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নোবেল দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল না। বরং রবীন্দ্রনাথে কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র ভাবার্থ এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা ইউরোপের বিদগ্ধ সমাজকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন।

২. শিরদাঁড়া বিক্রির মানুষ তিনি ছিলেন না

যাঁরা তাঁকে ‘ব্রিটিশদের তোষামোদকারী’ বলেন, তাঁরা হয়তো ইতিহাস ভুলে গেছেন অথবা জেনেও এড়িয়ে যান। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইটহুড’ উপাধি দিয়েছিল সত্য, কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই রাজকীয় সম্মান ঘৃণাভরে বর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশ ভাইসরয়কে লেখা তাঁর সেই ঐতিহাসিক চিঠিটি আজও প্রতিটি বাঙালির গর্বের দলিল। যাঁর মেরুদণ্ড এতটা শক্ত ছিল যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মুখের ওপর সম্মান ছুড়ে মারতে পারেন, তাঁকে ‘তোষামোদকারী’ বলাটা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

৩. ‘সস্তা বুদ্ধিজীবী’ হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা

বর্তমান প্রজন্মের একটা বড় অংশের মধ্যে বই পড়ার চেয়ে ফেসবুক বা ইউটিউবের ‘সস্তা প্রচারণা’য় বিশ্বাস করার প্রবণতা বেশি। না পড়ে, না জেনে, কোনো গবেষণা ছাড়াই মহান কোনো ব্যক্তিত্বকে ছোট করে নিজেকে ‘খুব বুদ্ধিমান’ বা ‘কট্টর সমালোচক’ প্রমাণ করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এই সস্তা জনপ্রিয়তার নেশা আমাদের মৌলিক জ্ঞান চর্চাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

৪. জাতীয় পরিচয় ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব

যে মানুষটি আমাদের ভাষাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিলেন, যাঁর লেখা গান আমাদের জাতীয় সংগীত—তাঁকে নিয়ে নোংরা রাজনীতি বা বিকৃত বিতর্ক করা আমাদের জাতির নৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে। কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার শেকড় ও সংস্কৃতিতে আঘাত করতে হয়; রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করা মানে সেই শেকড়কেই উপড়ে ফেলা।

৫. ইতিহাস চলে তথ্যে, আবেগে নয়

ইতিহাস আবেগ বা কাল্পনিক গল্পের ওপর ভিত্তি করে চলে না; ইতিহাস চলে অকাট্য তথ্য আর প্রমাণের ওপর। কোনো মহান মানুষকে টেনে নিচে নামালেই নিজে বড় হওয়া যায় না। বরং এই ধরণের নিম্নমানের চিন্তাভাবনা আমাদের সামষ্টিক মগজের দৈন্যদশাই তুলে ধরে।

উপসংহার: আসুন, অন্ধ সমালোচনা বাদ দিয়ে আমরা আগে পড়তে শিখি, প্রকৃত ইতিহাস জানতে শিখি। তথ্য প্রযুক্তির যুগে তথ্যের অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক জ্ঞানের। নতুবা এই ‘অসুস্থ প্রজন্মের’ তকমা আমাদের চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

 

এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান।Rabindranath Tagore Nobel Prize History

Scroll to Top